কলকাতা, ৯ এপ্রিল : বিশ্ব হোমিওপ্যাথি দিবসের আগে, ভারতে হোমিওপ্যাথির ইতিহাস-সংক্রান্ত আখ্যানগুলো পুনরায় পর্যালোচিত হচ্ছে, যা এর প্রাথমিক গ্রহণ এবং গঠনে বাংলার গুরুত্বপূর্ণ, অথচ স্বল্প-স্বীকৃত, ভূমিকাটিকে সামনে নিয়ে আসছে। যদিও ভারতে হোমিওপ্যাথির সূচনালগ্নকে প্রায়শই পাঞ্জাবের রাজা রণজিৎ সিংয়ের রাজদরবারের সাথে যুক্ত করে দেখা হয়, তবুও অপেক্ষাকৃত কম নথিবদ্ধ কিছু বিবরণ থেকে জানা যায় যে, ভারতে হোমিওপ্যাথির প্রাথমিক ভিত্তি স্থাপনে পশ্চিমবঙ্গই মূল বা মৌলিক ভূমিকা পালন করেছিল।
বাংলার সঙ্গে হোমিওপ্যাথির সম্পৃক্ততা উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হয়, যখন সমাজ সংস্কার আন্দোলন এবং সম্প্রদায়-ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই চিকিৎসা পদ্ধতির প্রসার ঘটতে শুরু করে। তা সত্ত্বেও, এর অবদানের প্রকৃত প্রভাব পুরোপুরিভাবে অনুধাবন করা হয়নি। এই যাত্রাপথের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, যিনি ১৮৬৪ সাল থেকে তাঁর সমাজসেবামূলক কাজে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা অন্তর্ভুক্ত করেন এবং হাজার হাজার মানুষকে, বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত সম্প্রদায়ের মানুষদের, চিকিৎসা পরিষেবা প্রদান করেন। বৃহৎ পরিসরে হোমিওপ্যাথিকে সহজলভ্য করার প্রথম দিকের পদ্ধতিগত প্রচেষ্টাগুলোর মধ্যে তাঁর কাজটি অন্যতম ছিল।
এই গতিধারা তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র মহর্ষি পরেশনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় কর্তৃক মিহিজামে (বর্তমান ঝাড়খণ্ডে) বিশ্ববিখ্যাত এক হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেছিল। ঐতিহাসিক নথিপত্র থেকে জানা যায় যে, এই কেন্দ্রটি অবিভক্ত ভারতের জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ মানুষকে চিকিৎসা সেবা প্রদান করেছিল যা সেই সময়ে চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে ছিল এক নজিরবিহীন ও বিশাল পরিসর। এই কাজটি এগিয়ে নিয়ে যান তাঁর পুত্র, প্রখ্যাত প্রয়াত অধ্যাপক ডঃ পরিমল ব্যানার্জী।
আজও পশ্চিমবঙ্গে ভারতের অন্যতম বৃহত্তম হোমিওপ্যাথিক ব্যবহারকারী গোষ্ঠী বিদ্যমান; এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই চিকিৎসা পদ্ধতির প্রতি বজায় থাকা সাংস্কৃতিক গ্রহণযোগ্যতাকেই প্রতিফলিত করে যার পেছনে আংশিকভাবে পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং তাঁর পরিবারের অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে। চার প্রজন্ম পেরিয়েও, এই পরিবারের সমাজসেবামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে; এমনকি সুদূর নয়াদিল্লিতেও ‘ডা. কল্যাণ ব্যানার্জি’স ক্লিনিকে গত ৪৯ বছর ধরে যা আজও চলমান বিনামূল্যে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হচ্ছে।
পদ্মশ্রী প্রাপক এবং ডা. কল্যাণ ব্যানার্জি’স ক্লিনিক-এর প্রতিষ্ঠাতা ডা. কল্যাণ ব্যানার্জি বলেন, “ভারতের প্রথম হোমিওপ্যাথিক কলেজ ‘পি. ব্যানার্জি মিহিজাম ইনস্টিটিউট অফ হোমিওপ্যাথি’-তে প্রফেসর ডা. পরিমল ব্যানার্জির তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ গ্রহণের সৌভাগ্য আমার হয়েছিল।“
ডা. কল্যাণ ব্যানার্জি’স ক্লিনিকের ডা. কুশল ব্যানার্জি বলেন, “ভারতে হোমিওপ্যাথি চর্চায় বাংলার যে অবদান, তা তার প্রাপ্য মনোযোগ পায়নি। জনস্বাস্থ্যসেবায় পণ্ডিত বিদ্যাসাগরের প্রচেষ্টা থেকে শুরু করে বৃহৎ পরিসরে চিকিৎসা প্রদানের বিভিন্ন উদ্যোগ হোমিওপ্যাথির প্রাথমিক প্রসার ও রূপায়ণে বাংলা এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই অবদানগুলোকে নতুন করে পর্যালোচনা করা এবং আরও বিস্তারিতভাবে নথিবদ্ধ করা এখন সময়ের দাবি।“
0 Comments