ওয়েব ডেস্ক : অ্যাসিডিটি কী এবং কেন হয়
অ্যাসিডিটি একটি খুব সাধারণ হজমজনিত সমস্যা, যা মূলত পাকস্থলীতে অতিরিক্ত অ্যাসিড উৎপন্ন হওয়ার ফলে দেখা দেয়। ঝাল বা তেলযুক্ত খাবার, অনিয়মিত খাবারের সময়, মানসিক চাপ, ঘুমের অভাব এবং অতিরিক্ত চা-কফি পান—এই সবই অ্যাসিডিটির প্রধান কারণ। সাধারণত বুকে বা পেটের উপরের অংশে হালকা জ্বালাপোড়া, পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি অনুভূত হয়। এই সমস্যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাময়িক এবং জীবনযাত্রায় সামান্য পরিবর্তন বা ওভার-দ্য-কাউন্টার অ্যান্টাসিডের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
অ্যাসিড রিফ্লাক্স কেন হয়
অ্যাসিড রিফ্লাক্স তখন হয়, যখন পাকস্থলীর অ্যাসিড উল্টো দিকে খাদ্যনালীতে উঠে আসে। এটি ঘটে খাদ্যনালীর নিচের অংশে থাকা একটি পেশি—লোয়ার ইসোফেজিয়াল স্পিঙ্কটার—দুর্বল হয়ে পড়লে বা সঠিকভাবে কাজ না করলে। এর ফলে বুকে জ্বালাপোড়া, মুখে টক বা তেতো স্বাদ, খাবার উঠে আসার অনুভূতি এবং খাওয়ার পর বা শুয়ে পড়লে অস্বস্তি বেড়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। মাঝে মধ্যে রিফ্লাক্স হওয়া স্বাভাবিক হলেও, যদি এটি ঘন ঘন হয়, তাহলে তা গুরুতর সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
কখন রিফ্লাক্স জিইআরডিতে পরিণত হয়
গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ বা জিইআরডি একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা, যেখানে অ্যাসিড রিফ্লাক্স বারবার হয় এবং দৈনন্দিন জীবন ও ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। জিইআরডিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায়ই বারবার হার্টবার্ন, গিলতে অসুবিধা, বুকে ব্যথা, দীর্ঘদিনের কাশি, গলার স্বর বসে যাওয়া এবং সারাক্ষণ অ্যাসিডিটির অনুভূতি হতে পারে। অনেক সময় এই উপসর্গগুলো হৃদরোগের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়, যার ফলে রোগ নির্ণয়ে দেরি হয়।
জিইআরডিকে অবহেলা করা কেন বিপজ্জনক
চিকিৎসা না করালে জিইআরডি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মারাত্মক জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে খাদ্যনালীতে অ্যাসিডের সংস্পর্শে থাকলে সেখানে প্রদাহ, ঘা বা সংকোচন হতে পারে, যার ফলে খাবার গিলতে ব্যথা ও অসুবিধা হয়। কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী জিইআরডি থেকে ব্যারেটস ইসোফেগাস নামক একটি অবস্থা তৈরি হতে পারে, যা খাদ্যনালীর ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই সময়মতো রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা অত্যন্ত জরুরি।
কখন অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন
যদি সপ্তাহে দুইবারের বেশি হার্টবার্ন হয়, ওষুধ খেয়েও উপসর্গ না কমে, অথবা খাবার গিলতে ব্যথা, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, দীর্ঘদিনের কাশি, শ্বাসকষ্ট বা বুকে ব্যথা দেখা দেয়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এই উপসর্গগুলো জিইআরডি বা অন্য কোনও গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা পদ্ধতি
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উপসর্গের ভিত্তিতেই রোগ নির্ণয় করা যায়। তবে প্রয়োজনে এন্ডোস্কোপি বা খাদ্যনালীর অ্যাসিডের মাত্রা পরিমাপের মতো বিশেষ পরীক্ষা করা হতে পারে। চিকিৎসার মধ্যে সাধারণত অ্যাসিড উৎপাদন কমানোর ওষুধের পাশাপাশি জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তনের পরামর্শ দেওয়া হয়।
জীবনযাত্রার পরিবর্তনে উপকার
কিছু সহজ অভ্যাস পরিবর্তন করলেই অ্যাসিডিটি ও রিফ্লাক্স অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। অল্প অল্প করে বারবার খাওয়া, রাতে দেরিতে খাবার এড়ানো, ঝাল ও ভাজাভুজি কম খাওয়া, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং ধূমপান ত্যাগ করা অত্যন্ত কার্যকর। এছাড়া ঘুমানোর সময় মাথা একটু উঁচু করে শোয়া এবং খাওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে না পড়াও উপকারী।
শেষ কথা
মাঝে মধ্যে অ্যাসিডিটি হওয়া স্বাভাবিক এবং সাধারণত ক্ষতিকর নয়। তবে যদি হার্টবার্ন বারবার হতে থাকে, তাহলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। দীর্ঘস্থায়ী উপসর্গ অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা জিইআরডির লক্ষণ হতে পারে, যার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সময়মতো চিকিৎসা শুরু করলে জটিলতা এড়ানো যায় এবং সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব হয়।
(ডা. পিনাকি সুন্দর কর কনসালট্যান্ট – গ্যাস্ট্রোএনটেরোলজিস্ট ও হেপাটোলজিস্ট, মণিপাল হসপিটাল, শিলিগুড়ি)
0 Comments